ঘাটাইলে পাল যুগের খননকৃত সাগরদিঘী কী ধ্বংসের মুখে?

টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পূর্বে, এক পাহাড়িয়া এলাকায় লোহানী নামক গ্রামে অবস্থিত, একটি ঐতিহাসিক দিঘীর নাম সাগরদিঘী। এই এলাকাটি মধুপুর ভাওয়াল গড়েরই একটি অংশ।

পাল যুগের ইতিহাস বহনকারী এ দিঘীটির খুব কাছাকাছিই রয়েছে হিন্দু ধর্মের রাধাকৃষ্ণের তমালতলা, গুপ্ত বৃন্দাবন, লক্ষিন্দরের বাবা চাঁদ সওদাগরের বাড়ি এবং বেহুলা লক্ষিন্দরের পদ্মদিঘী।

ইতিহাসের এসকল বিষয় গুলো দেখেই বুঝা যায়, এই এলাকার সভ্যতার ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ ও  প্রাচীন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, পাল শাসনামলে এই দিঘীটি খনন করা হয়েছিল।

কথিত আছে, রাজা সাগর পাল তার প্রজাদের জন্য সুপেয় পানি ব্যবস্থার উদ্দেশ্যে একটি দিঘী খননের সিদ্ধান্ত নেয়। এক সময় দিঘীটি খননের কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়। যেটি খনন করতে নিয়মিত কাজ করা ২০০০ শ্রমিকের ২ বছর সময় লাগে।

প্রায় ৪০ একর জমির পরিমান এই দিঘীর আয়তন। খননের পর পর্যাপ্ত পরিমাণে গভীরতা থাকা সত্বেও দিঘীতে পানি না উঠলে, রাজা অনেকটাই চিন্তিত হয়ে পড়েন। হঠাৎ এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে দিঘীতে নামালেই পানি উঠবে। রাজার কাছ থেকে এমনটা শোনার পর প্রজাদের স্বার্থে রানী দিঘীতে নামার সিদ্ধান্ত নিলেন।

দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার পর হাজারো জনতার সামনে রানী দিঘীর কিছুদূর যেতে না যেতেই পানি উঠে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রানীর শরীর পানিতে ডুবে যায় এবং পরক্ষণেই তিনি মারা যান। হাজারও চেষ্টার পর রাজা, রানীকে কোনভাবেই বাঁচাতে পারলেন না।

তার আত্মত্যাগে পানিশূন্য দিঘীর  বুক জলে ভরে উঠলো এবং পরিপূর্ণতা লাভ করল। আর এই সাগর রাজার নামেই দিঘীটির নামকরন করা হয় সাগরদিঘী।

এ অনুসারে গ্রামের নামও লোহানী থেকে হয়ে যায় সাগরদিঘী।

আবার দিঘীটি রাজা মহীপালের খনন করানোর কথাও শোনা যায়।

উল্লেখ্য, ৯৮৮ থেকে ১০৭৫ সাল পর্যন্ত ১ম ও ২য় মহীপালের রাজত্ব ছিল। রাজা মহীপাল উত্তরবঙ্গ থেকে বিতাড়িত হয়ে চন্দনবাটী নামক স্থানে রাজধানী স্থাপন করেন। এজন্য তিনি রাজ্যের সভাসদসহ সৈন্যবহর নিয়ে রাজধানীতে এই পথে যাওয়ার সময় এক ব্রাহ্মণের এক ছেলে রানীকে দেখার জন্য গাছে উঠলে, হঠাৎ গাছ থেকে পড়ে যুবক তথা ঐ ব্রাহ্মণ সন্তানের মৃত্যু হয়। পরে রাজা ব্রাহ্মণ হত্যার দায়ে অভিযুক্ত হন।

পুরোহিতদের কাছে এর সমাধান চাইলে, রাজাকে প্রায়শ্চিত্ত সরুপ একটি দিঘী খনন করতে বলা হয় এবং ব্রাহ্মণ সন্তানের মৃত্যুর স্থান থেকে রাজধানী পর্যন্ত রানীকে হেঁটে যেতে বলা হয়। আর সেই দৈর্ঘ্য বরাবরই এই দিঘীটি খননের কথা বলা হয়।

তাদের কথা মতো দিঘী খনন করার পর গভীরতা থাকা সত্ত্বেও পানি না উঠলে, রাজা মহীপাল চিন্তায় পড়ে যান। পরে রাজা একদিন স্বপ্নে দেখেন যে, ওই এলাকায় বাস করা সাগর নামের এক ধর্মপরায়ণ কুমারকে দিয়ে দিঘীর তলদেশ থেকে এক কোদাল মাটি তুলালেই পানি উঠবে। রাজার স্বপ্ন অনুযায়ী ঐ কুমার দিঘির তলদেশ থেকে এক কোদাল মাটি তুললে কানায় কানায় ভরে যায় দিঘী এবং সেখানেই সাগর কুমারের মৃত্যু হয়।

কারো কারো মতে, তাঁর নামানুসারেই দিঘীটির নাম রাখা হয় সাগরদিঘী।

কিন্তু  অনেকের মতে, সাগর রাজার খনন করানোর কথাই বেশি প্রচলিত এবং গ্রহণযোগ্য। তবে খননের ইতিহাস যেটিই হোক, দিঘীটি যে প্রাচীন তাতে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।

পাড় মোটামুটি চওড়া হওয়াতে দিঘীটির চতুর্দিকে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। উত্তর পাড়ে সাগরদিঘী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, দক্ষিণ পাড়ে সাগরদিঘী দাখিল মাদ্রাসা, পূর্বপাড়ে সাগরদিঘী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র ও পশ্চিম পাড়ে রয়েছে অস্থায়ী এলজিইডি বাংলো ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

দিঘীর পশ্চিম পাড়টি ছিল বেশ প্রশস্ত। অনেকের মতে, পশ্চিমপাড়েই ছিল রাজার রাজবাড়িটি। কারণ, পুরনো স্থাপত্যের ভিত্তি, প্রাচীন ইট ও ইটের টুকরোসহ বেশকিছু ধ্বংসাবশেষ এই পাড়ে এখনো বিদ্যমান।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই স্থানটি অনেক পবিত্র। তারা সাগর রাজার স্ত্রীর আত্মাকে শান্তিতে রাখতে অনেক সময় পূজা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। তাছাড়া এখানে অনেকে, অনেক কিছু মানত করে থাকে। পূর্বে সাধু-সন্ন্যাসীরা দিনের পর দিন এখানেই কাটাতেন।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল যে, অন্যান্য পুকুর-নদী-খাল-বিল এর চেয়ে অনেক বেশি ঠান্ডা এর পানি, এজন্য প্রচন্ড গরমে চেনা-অচেনা সকলেই তৃষ্ণা মেটাতো এ জলাধারে। একসময় এই দিঘীর যৌবনের ছটায় মুগ্ধ হত সর্বস্তরের মানুষ। এর অপরুপ সৌন্দর্য প্রকৃতিপ্রেমীদের মনে দোলা দিত বারংবার।

চতুর্দিকের সবুজ গাছগাছালি ছিল রকমারি পশু-পাখির নিরাপদ অভয়ারণ্য। সবুজ ও স্বচ্ছ পানির নীরবতা যেন সকলের হৃদয় ছুঁয়ে দিত। হাজারো মানুষের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার একটি উপযুক্ত স্থান ছিল এটি।

একসময়ে দিঘীটির পানি, খাওয়া ও গোসলসহ আনুষঙ্গিক সকল কাজে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সবার প্রিয় এ দীঘিটি আজ ধ্বংসের মুখোমুখি। অর্থাৎ হাত ধোয়ার উপযোগীও যেন নেই এর পানি। কেউ যেন ফিরেও তাকায় না এর দিকে।

অবৈধভাবে দিঘীর দক্ষিণ ও পশ্চিম পাড় দখল করে এখানে গড়ে তোলা হয়েছে বড় বড় মুরগির লেয়ার। লেয়ারের সকল বর্জ্যপদার্থ ফেলা হচ্ছে এই দিঘীতে। আবার পাড় দখল করে গড়ে তুলা হয়েছে বেশ কিছু বসত বাড়িও।

তাছাড়াও লীজ নিয়ে এখানে করা হচ্ছে মাছের চাষ। ফলে ব্যাপকভাবে দূষিত হচ্ছে সাগর রাজার স্মৃতিবিজড়িত এ দিঘীর পানি। বাতাসে বাতাসে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। এলাকাবাসী ও প্রকৃতির জন্য যেটি অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার।

বিশেষ করে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য। হাজার হাজার শিক্ষার্থী পাচ্ছে না বিশুদ্ধ বাতাসের ছোঁয়া। প্রকৃতিপ্রেমীরাও ফেলতে পারছে না একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস।

আর পানি দূষণের পাশাপাশি দিঘীটি ক্রমেই হারাচ্ছে তার গভীরতা।

অবৈধভাবে পাড় দখল, লেয়ারের বর্জ্য ফালানোর ব্যাপার ও এটি সংস্কারের ব্যাপারে প্রশাসনের গ্রহণযোগ্য কোনো উদ্যোগ বা কর্মসূচী এখনও দৃশ্যমান হয়নি। যেটি খুবই হতাশাজনক।

এই দিঘীটির পাশেই এর থেকেও বিশাল, সেই পাল যুগেই খননকৃত “বইন্যা দিঘী” নামের আরেকটি দিঘী রয়েছে। যেটি সাগর রাজার পুত্র বনরাজ পাল তার বাবার কৃতিত্বকে টেক্কা দিতে খনন করেছিলেন। তার আরেকটু উত্তর দিকেই তখনকার আমলেরই “কোদাল ধোয়া পুকুর” নামের আরো একটি দিঘী রয়েছে। যেগুলো প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে নিরবে বুকে ধারণ করছে।

এই ঐতিহাসিক স্থানগুলি দেশের পর্যটন শিল্পের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিঃসন্দেহে এগুলো দেশের জাতীয় সম্পদ, এগুলো রক্ষা করাটা জাতীয় স্বার্থ এবং দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অধিকাংশ মানুষেরই প্রাণের দাবি।

এজন্য যদি এই দিঘীকে ঘিরে নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে সরকার বা প্রশাসন কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং তার যথোপযুক্ত বাস্তবায়ন ঘটায়, তাহলে বৃহৎ একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তবেই কিছুটা হলেও দিঘীটি তার পূর্বের অবস্থা ফিরে পেতে পারে। নয় এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের ব্যবধানে দিঘীটি নিজস্ব সৌন্দর্য হারিয়ে ধ্বংসের মুখে পতিত হবে।

ইতিহাস শুধু ইতিহাসই রয়ে থাকবে, দিঘীকে আর দিঘীর মত পাওয়া যাবেনা।

(মোঃ জাফর আলী, শিক্ষার্থী, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)/-

নিউজ ডেস্ক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Next Post

গোপালপুরে বৃক্ষ রোপন করলেন যুবলীগ নেতা হিমেলুর রহমান হিমেল

শুক্র জুন ২৬ , ২০২০
বিধান রায়,গোপালপুর সংবাদদাতা: মুজিববর্ষ উপলক্ষে কেন্দ্রীয় কর্মসুচীর অংশ হিসেবে ২৫ জুন বৃহস্পতিবার গোপালপুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের মোহনপুর পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়, মোহনপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়,মোহনপুর কোরআন ও নুরানি মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে ও ধুলটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে মির্জাপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহবায়ক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ […]